ঢাকা, শনিবার ২১, ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ৫:০০:০৬ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
নারী ভাষা সৈনিকরা আজও অবহেলিত ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা জানালেন রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী অমর একুশে ফেব্রুয়ারি ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস আজ পাকিস্তানকে উড়িয়ে ফাইনালে বাঘিনীরা ২৬ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শহীদ দিবস ঘিরে দেশজুড়ে নিরাপত্তা বলয় টিসিবির ট্রাকসেলে ক্রেতার উপচে পড়া ভিড়

যাঁদের কণ্ঠে ছিল না মাইক, তবু ইতিহাস শুনেছে: নারী ভাষা সৈনিক

জোসেফ সরকার | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ১২:৩৩ এএম, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ শনিবার

প্রতীকী ছবি।

প্রতীকী ছবি।

‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি আমি কি ভুলিতে পারি...!’ একুশে ফেব্রুয়ারি মানে শুধু রক্তাক্ত রাজপথ নয়। একুশে মানে শুধু গুলির শব্দ নয়। একুশে মানে ঘরের ভেতরে বসে থাকা কিছু নারীর নিঃশব্দ বিদ্রোহও। যাঁদের চোখে ছিল আগুন, কণ্ঠে ছিল সাহস, আর বুকের ভেতর ছিল বাংলার জন্য অপার ভালোবাসা।

তাঁরা কেউ মিছিলের সামনে ছিলেন, কেউ ছিলেন পেছনের সারিতে। কেউ পোস্টার লিখেছেন, কেউ লিফলেট ছাপিয়েছেন, কেউ আহত ছাত্রকে লুকিয়ে রেখেছেন নিজের ঘরে, কেউ আবার কাঁপা হাতে লিখেছেন প্রতিবাদের কবিতা।

ইতিহাসের পাতায় তাঁদের নাম ছোট অক্ষরে লেখা, কিন্তু বাংলার আত্মায় তাঁদের অবদান বড় হরফে খোদাই করা।

কবিতার ভেতর লুকানো প্রতিবাদ: সুফিয়া কামাল

যখন রাজপথে পুলিশের লাঠি আর গুলির শব্দ, তখন এক নারীর কলম লিখছিল—ভাষার জন্য লড়াই মানে অস্তিত্বের জন্য লড়াই। সুফিয়া কামাল ছিলেন কবি, কিন্তু তাঁর কবিতা ছিল শুধু প্রেমের নয়— তাঁর কবিতা ছিল প্রতিবাদের ভাষা। তিনি নারীদের উদ্বুদ্ধ করেছেন রাস্তায় নামতে, বলেছেন—“ভাষা যদি না বাঁচে, মানুষও বাঁচে না।”

মিছিলে মেয়েদের অংশগ্রহণ তখন ছিল সমাজের চোখে ‘অস্বাভাবিক’। কিন্তু তিনি দেখিয়েছিলেন—মেয়েরা শুধু ঘরের ভেতর নয়, মেয়েরা ইতিহাসের ভেতরও জায়গা নেয়।

নীরব সংগঠকের শক্ত কণ্ঠ: নীলিমা ইব্রাহিম

ভাষা আন্দোলনের অনেক যুদ্ধ হয়েছিল রাজপথের আড়ালে। লিফলেট ছাপানো, বৈঠক আয়োজন, ছাত্রদের আশ্রয় দেওয়া—এসব যুদ্ধের সৈনিক ছিলেন নীলিমা ইব্রাহিম।

তিনি জানতেন, একটি সভা মানে শুধু কয়েকজন মানুষ জড়ো হওয়া নয়, একটি সভা মানে ভবিষ্যতের বীজ বোনা। তাঁর লেখা, তাঁর সংগঠন, তাঁর সাহস—সব মিলিয়ে তিনি ছিলেন আন্দোলনের নীরব মেরুদণ্ড।

ভাষা থেকে মুক্তিযুদ্ধ: এক নারীর দীর্ঘ লড়াই — জাহানারা ইমাম

ভাষা আন্দোলনের সময় তিনি ছিলেন তরুণী। বাংলার জন্য প্রতিবাদ ছিল তাঁর জীবনের প্রথম রাজনৈতিক পাঠ। পরবর্তী সময়ে তাঁর জীবন বদলেছে, কিন্তু বদলায়নি তাঁর বিশ্বাস— এই দেশ, এই ভাষা, এই মানুষ—সবকিছুর জন্য লড়াই করতে হয়। ভাষার জন্য যে কণ্ঠ প্রথম কেঁপেছিল, সেই কণ্ঠই একদিন বলেছিল—“ঘাতকদের বিচার চাই।”

পেছনের সারির মেয়েরা: যাঁদের নাম লেখা নেই

ইতিহাসে লেখা আছে কয়েকজনের নাম, কিন্তু লেখা নেই সেই শত শত নারীর কথা— যাঁরা ভাত রেঁধে দিয়েছেন মিছিলফেরত ছাত্রদের, যাঁরা নিজেদের গয়না বিক্রি করে ছাপাখানার খরচ জুগিয়েছেন, যাঁরা ভয় পেয়েও দরজা খুলে দিয়েছেন আহত আন্দোলনকারীকে, যাঁরা রাতে কাঁদতে কাঁদতে সকালে আবার সাহসী হয়েছেন।

তাঁদের নাম কেউ জানে না, কিন্তু বাংলা ভাষা তাঁদের সবাইকে চেনে।

একুশের রাজনীতি আর নারীর শরীর

সে সময় নারীর রাস্তায় নামা মানেই ছিল সমাজের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। ভাষার দাবি তাই ছিল দ্বিগুণ বিপ্লবী— একদিকে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে, অন্যদিকে পুরুষতান্ত্রিক চোখের বিরুদ্ধে। এক হাতে প্ল্যাকার্ড, আরেক হাতে ওড়না সামলে, মেয়েরা বুঝিয়ে দিয়েছিল— ভাষা শুধু পুরুষের দাবি নয়, ভাষা মায়েরও দাবি।

আজকের মেয়েরা, গতকালের উত্তরাধিকার

আজ যখন একুশে ফেব্রুয়ারিতে মেয়েরা ফুল দেয় শহীদ মিনারে, তারা শুধু শহীদদের শ্রদ্ধা জানায় না— তারা সেই নারী ভাষা সৈনিকদেরও স্মরণ করে, যাঁরা শেখিয়েছিলেন— ভাষা মানে অধিকার, আর অধিকার মানে প্রতিবাদ।

শেষ কথা

ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস মানে শুধু রক্তের ইতিহাস নয়, এটি ভালোবাসার ইতিহাস। এটি নারীর সাহসের ইতিহাস। যাঁরা রাজপথে নামতে পেরেছিলেন, তাঁরা ইতিহাস হয়েছেন। যাঁরা নামতে পারেননি, তাঁরা ইতিহাস বানিয়েছেন।

একুশে ফেব্রুয়ারি তাই শুধু শহীদের দিন নয়, এটি নারী ভাষা সৈনিকদেরও দিন— যাঁদের কণ্ঠে ছিল না মাইক, কিন্তু যাঁদের নিঃশ্বাসে ছিল বাংলা।