ঢাকা, রবিবার ০২, আগস্ট ২০২৬ ৩:১০:৫৬ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
মরক্কো থেকে সাঁতরে স্পেনে ৬০ হাজার অভিবাসী ঢাকায় দিনের বেলা ঘরে ঢুকে নারী চিকিৎসককে হ/ত্যা জুলাইয়ে নারী নির্যাতন কমলেও বেড়েছে ধ/র্ষণ ও আত্ম/হ/ত্যা খুলনায় ট্রাকচাপায় একই পরিবারের ৩ নারী-শিশুর প্রাণহানী নাস্তার টেবিলেই নিভে গেল ঢাবি অধ্যাপক দীপ্তি সাহার জীবন

হ্যারি পটারের স্রষ্টা জে. কে. রাউলিং-এর জন্মদিনে শ্রদ্ধা

অনু সরকার | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০৪:২৫ পিএম, ১ আগস্ট ২০২৬ শনিবার

ছবি: সংগ্রহিত।

ছবি: সংগ্রহিত।

৩১ জুলাই। পৃথিবীর কোটি কোটি পাঠকের কাছে দিনটি শুধু একজন লেখকের জন্মদিন নয়; এটি কল্পনার এক অনন্য জগতের স্রষ্টাকে স্মরণ করার দিন। এই দিনেই ১৯৬৫ সালে ইংল্যান্ডের ইয়েট শহরে জন্ম নেন বিশ্বখ্যাত ব্রিটিশ লেখক জোয়ান রাউলিং, যিনি সারা পৃথিবীতে জে. কে. রাউলিং (J. K. Rowling) নামে পরিচিত। আশ্চর্যের বিষয়, তাঁর সৃষ্ট সবচেয়ে জনপ্রিয় চরিত্র হ্যারি পটার-এর জন্মদিনও ৩১ জুলাই। যেন লেখক ও তাঁর কালজয়ী নায়কের জন্মদিন একই দিনে বেঁধে দিয়েছে এক অদ্ভুত সাহিত্যিক বন্ধনে।

আজ তাঁর জন্মদিনে ফিরে দেখা যাক এক সংগ্রামী নারীর অবিশ্বাস্য সাফল্যের গল্প, যিনি প্রমাণ করেছেন—স্বপ্ন কখনো হারিয়ে যায় না, যদি মানুষ সেটিকে আঁকড়ে ধরে রাখতে পারে।

সাধারণ এক মেয়ে থেকে বিশ্বসাহিত্যের কিংবদন্তি

জে. কে. রাউলিংয়ের শৈশব কেটেছে বই পড়ে, গল্প লিখে এবং কল্পনার জগতে ঘুরে বেড়িয়ে। ছোটবেলাতেই তিনি গল্প লিখতে শুরু করেন। মাত্র ছয় বছর বয়সে লেখা তাঁর প্রথম গল্প ছিল একটি খরগোশকে নিয়ে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ফরাসি ভাষা ও সাহিত্যে পড়াশোনা শেষে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। জীবনের শুরুটা মোটেও সহজ ছিল না। কিছুদিন পর তিনি পর্তুগালে চলে যান। সেখানে শিক্ষকতা করেন এবং বিয়ে করেন। কিন্তু সেই সংসার টেকেনি। একমাত্র ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে তিনি ইংল্যান্ডে ফিরে আসেন।

তখন তাঁর জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়। অর্থনৈতিক সংকট, একাকীত্ব, হতাশা—সবকিছু মিলিয়ে তিনি সরকারি ভাতার ওপর নির্ভর করে দিন কাটাতেন। অনেক সময় ক্যাফেতে বসে মেয়েকে ঘুম পাড়িয়ে তিনি লিখতেন তাঁর স্বপ্নের গল্প।

সেই গল্পই একদিন বদলে দেয় তাঁর জীবন।

ট্রেনযাত্রায় জন্ম নেয় এক জাদুকর

১৯৯০ সালের এক ট্রেনযাত্রা। ম্যানচেস্টার থেকে লন্ডনে ফিরছিলেন রাউলিং। ট্রেন দেরি করছিল। সেই দীর্ঘ অপেক্ষার সময় হঠাৎ তাঁর কল্পনায় ভেসে ওঠে চশমা পরা এক কিশোর, যে জানেই না সে একজন জাদুকর।

এই একটি ভাবনা থেকেই জন্ম নেয় হ্যারি পটার।

পরে তিনি বহুবার বলেছেন, সেই মুহূর্তে তাঁর কাছে কোনো কাগজ-কলম ছিল না। তাই পুরো গল্পটি তিনি মনে মনে সাজিয়ে রাখেন। বাড়ি ফিরে লিখতে শুরু করেন। তারপর শুরু হয় সাতটি বইয়ের দীর্ঘ যাত্রা।

প্রত্যাখ্যানের পরও হার মানেননি

প্রথম বই "Harry Potter and the Philosopher's Stone" প্রকাশের আগে রাউলিংকে একের পর এক প্রকাশকের দরজায় ঘুরতে হয়েছে।

মোট ১২টি প্রকাশনা সংস্থা তাঁর পাণ্ডুলিপি ফিরিয়ে দেয়।

অবশেষে ছোট একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান Bloomsbury বইটি প্রকাশে রাজি হয়। প্রকাশকের আট বছর বয়সী মেয়ে প্রথম অধ্যায় পড়ে বাকিটা পড়তে চাইলে তারা বুঝতে পারে—এই বইয়ের মধ্যে অন্যরকম কিছু আছে।

১৯৯৭ সালে বইটি প্রকাশিত হয়। তারপর আর তাকে ফিরে তাকাতে হয়নি।

এক বই, এক বিশ্বজোড়া উন্মাদনা

হ্যারি পটার সিরিজের সাতটি বই প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বজুড়ে সৃষ্টি হয় অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তা।

বইগুলো ৮০টিরও বেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশেই শিশু, কিশোর, তরুণ এমনকি প্রাপ্তবয়স্ক পাঠকরাও হ্যারি, হারমায়োনি ও রনের অভিযানে মুগ্ধ হয়েছেন।

এই সিরিজের ৬০ কোটিরও বেশি কপি বিক্রি হয়েছে, যা ইতিহাসের অন্যতম সর্বাধিক বিক্রিত বইয়ের সিরিজ।

বই থেকে সিনেমা—বিশ্বজয়ের আরেক অধ্যায়

হ্যারি পটার শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকেনি।

এর ওপর নির্মিত আটটি চলচ্চিত্র বিশ্বব্যাপী বিপুল সাফল্য পায়। সিনেমাগুলো বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আয় করে এবং নতুন প্রজন্মের কাছে জাদুর পৃথিবীকে আরও জীবন্ত করে তোলে।

এরপর আসে Fantastic Beasts চলচ্চিত্র সিরিজ, থিম পার্ক, ভিডিও গেম, নাটক, খেলনা, সংগ্রহযোগ্য সামগ্রী—সব মিলিয়ে গড়ে ওঠে এক বিশাল সাংস্কৃতিক মহাবিশ্ব।

কেন এত জনপ্রিয় হ্যারি পটার?

হ্যারি পটার কেবল জাদুবিদ্যার গল্প নয়।

এটি বন্ধুত্ব, সাহস, ভালোবাসা, আত্মত্যাগ, ন্যায়বিচার, বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই এবং অন্ধকারের বিপরীতে আলোর জয়ের গল্প।

হগওয়ার্টসের জাদুবিদ্যার স্কুলে যেমন রয়েছে বিস্ময়, তেমনি রয়েছে বেড়ে ওঠার গল্প। তাই শিশুদের পাশাপাশি বড়রাও নিজেদের জীবনের নানা অনুভূতি খুঁজে পান এই বইয়ে।

শিশুদের বইয়ের ধারণাই বদলে দিয়েছেন

হ্যারি পটারের আগে অনেকেই মনে করতেন, মোটা বই শিশুদের আকর্ষণ করে না।

রাউলিং সেই ধারণা ভেঙে দেন।

শিশু ও কিশোরদের জন্য ৫০০, ৬০০ কিংবা ৭০০ পৃষ্ঠার বইও যে তারা আগ্রহ নিয়ে পড়তে পারে, সেটি তিনিই প্রমাণ করেন।

তাঁর বই পড়ে নতুন করে বইয়ের প্রতি আগ্রহী হয়েছে অসংখ্য শিশু-কিশোর। অনেক গবেষকের মতে, একটি প্রজন্মকে আবার বইমুখী করে তোলার পেছনে রাউলিংয়ের ভূমিকা অসাধারণ।

লেখক হিসেবে সাফল্যের বাইরেও

জে. কে. রাউলিং কেবল একজন সফল লেখক নন; তিনি সমাজসেবামূলক কাজেও সক্রিয়।

তিনি শিশু কল্যাণ, দারিদ্র্য দূরীকরণ, মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস গবেষণা এবং বিভিন্ন মানবিক উদ্যোগে কোটি কোটি ডলার দান করেছেন।

বিশ্বের ধনী লেখকদের তালিকায় বহু বছর ধরে তাঁর নাম রয়েছে। অথচ একসময় তিনি ছিলেন আর্থিক সংকটে থাকা একক মা।

অনুপ্রেরণার আরেক নাম

রাউলিংয়ের জীবন শেখায়—প্রত্যাখ্যান মানেই ব্যর্থতা নয়।

বারবার প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পরও তিনি লেখা থামাননি। যদি তিনি হাল ছেড়ে দিতেন, তাহলে পৃথিবী হয়তো কখনোই হ্যারি পটারকে পেত না।

তাঁর গল্প আজও লাখো তরুণ লেখককে সাহস জোগায়।

জন্মদিনে শ্রদ্ধা

জে. কে. রাউলিং শুধু একজন ঔপন্যাসিক নন; তিনি কল্পনার এমন এক দরজা খুলে দিয়েছেন, যেখানে প্রবেশ করলে বাস্তবের ক্লান্তি কিছুক্ষণের জন্য মিলিয়ে যায়।

হ্যারি পটার আমাদের শিখিয়েছে—সাহস সব সময় ভয় না পাওয়ার নাম নয়; ভয়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়েও সঠিক কাজটি করার নামই সাহস।

আজ ৩১ জুলাই, তাঁর জন্মদিনে বিশ্বের কোটি কোটি পাঠকের সঙ্গে আমরাও জানাই শুভেচ্ছা ও শ্রদ্ধা।

কারণ, জে. কে. রাউলিং আমাদের শুধু একটি বইয়ের সিরিজ উপহার দেননি; তিনি উপহার দিয়েছেন এমন এক কল্পনার রাজ্য, যেখানে আজও নতুন প্রজন্ম আশা, বন্ধুত্ব আর সাহসের আলো খুঁজে পায়।