ঢাকা, রবিবার ০৮, নভেম্বর ২০২৬ ২১:৫৯:৫২ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে পরীমনিকে আইনি নোটিশ শ্যামাপূজা ও দীপাবলি উৎসব আজ এইচএসসির ফল পুনর্নিরীক্ষণের আবেদনের সময় বাড়ল জাপানে শক্তিশালী ভূমিকম্প, আহত অন্তত ২২ মিস ইউনিভার্স বাংলাদেশের মুকুট জিতলেন সামিরা খান মাহি নড়াইলে ১৬ নারী দলের নৌকা বাইচ, নদীর দুই পাড়ে উৎসব ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম ও সিলেটে ট্রেন চলাচল বন্ধ

পরীমণি, সাংবাদিকতা ও ভিউ’র অসুস্থ প্রতিযোগিতা

দীপালি হাসান | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০৭:৪৭ পিএম, ৮ নভেম্বর ২০২৬ রবিবার

পরীমণি

পরীমণি

একজন অভিনেত্রীর অশোভন আচরণ যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি সাংবাদিকতার নামে কাউকে বিব্রত, অপদস্থ কিংবা ব্যক্তিগত আক্রমণ করাও পেশাগত দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না।

চিত্রনায়িকা পরীমণিকে ঘিরে আবারও বিতর্ক। এবার ঢাকার আদালত প্রাঙ্গণে। ৫ নভেম্বর একটি মামলায় হাজিরা দিতে আদালতে গেলে তাঁকে ঘিরে ধরেন একদল সাংবাদিক। ছবি ও ভিডিও ধারণের একপর্যায়ে সাংবাদিক রবিউল হোসাইনের সঙ্গে তাঁর বাগ্‌বিতণ্ডা হয়। পরীমণির অভিযোগ, ওই সাংবাদিক তাঁকে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে স্পর্শ করেছেন। অন্যদিকে সাংবাদিকের দাবি, তিনি এমন কিছু করেননি। বরং পরীমণি তাঁর মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়েছেন, তাঁকে গালিগালাজ করেছেন এবং প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছেন। ঘটনার সময় ধাক্কাধাক্কিতে কয়েকজন সাংবাদিক ও একজন বিচারপ্রার্থী আহত হওয়ার খবরও এসেছে।

ঘটনাটি নিয়ে দুই পক্ষেরই বক্তব্য রয়েছে। অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু এই ঘটনার মধ্য দিয়ে আমাদের বিনোদন সাংবাদিকতা এবং তারকাদের সঙ্গে সাংবাদিকদের সম্পর্কের যে অসুস্থ চিত্র সামনে এসেছে, তা নিয়ে কথা বলা জরুরি।

প্রথম প্রশ্ন, পরীমণিকে ঘিরে সাংবাদিকদের এত আগ্রহ কেন? তিনি কোথায় গেলেন, কী পরলেন, কার সঙ্গে কথা বললেন, কখন আদালতে গেলেন, কী বললেন, কী করলেন—সবকিছুই কেন সংবাদ? একজন অভিনেত্রীর জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত কি সংবাদমাধ্যমের বিষয়বস্তু হতে হবে?

অবশ্যই পরীমণি একজন জনপ্রিয় অভিনেত্রী। তাঁর অভিনয়, চলচ্চিত্র, পেশাগত সাফল্য, বক্তব্য কিংবা জনপরিসরে ঘটে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা নিয়ে সংবাদ প্রকাশের অধিকার গণমাধ্যমের রয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে কোনো মামলা হলে সেটিও সংবাদ। আদালতে হাজিরা দিতে গেলে সেটিও সংবাদ হতে পারে। কিন্তু সংবাদ প্রকাশের অধিকার আর একজন মানুষকে সারাক্ষণ ক্যামেরার সামনে আটকে রাখার অধিকার এক বিষয় নয়।

সাংবাদিকতা কি এখন শুধু তারকাদের পিছু নেওয়ার নাম? বিনোদন সাংবাদিকতার কাজ কি শুধু কে কী বললেন, কার সঙ্গে কোথায় দেখা গেলেন, কে কাকে কী উত্তর দিলেন—এসব নিয়ে চটকদার শিরোনাম তৈরি করা?

আমাদের দেশের বিনোদন সাংবাদিকতার একটা বড় অংশ এখন যেন সংবাদ অনুসন্ধানের চেয়ে ব্যক্তির প্রতিক্রিয়া অনুসন্ধানে বেশি ব্যস্ত। একজন তারকা একটু বিরক্ত হলেই ক্যামেরা সামনে এগিয়ে যায়। তিনি কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে না চাইলে একই প্রশ্ন বারবার করা হয়। তাঁর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে এমন সব প্রশ্ন করা হয়, যার সঙ্গে তাঁর শিল্পীসত্তা কিংবা পেশাগত কাজের কোনো সম্পর্ক নেই। কখনো কখনো প্রশ্নের ভাষা ও উপস্থাপনাও হয়ে ওঠে বিব্রতকর।

এগুলো কি সাংবাদিকতা? নাকি কাউকে উত্তেজিত করে একটি প্রতিক্রিয়া আদায়ের চেষ্টা?

ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমের এই সময়ে ভিউ, ক্লিক ও শেয়ার যেন অনেকের কাছে সাংবাদিকতার সাফল্যের প্রধান মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে। একজন তারকার সঙ্গে সামান্য বাগ্‌বিতণ্ডা হলে সেটি মুহূর্তেই ভিডিওতে পরিণত হয়। শিরোনামে থাকে উত্তেজনা, থাম্বনেইলে থাকে মুখভঙ্গি, আর প্রতিবেদনের মূল বিষয়বস্তুর চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় কে কাকে কী বললেন।

এমনকি কোনো তারকার ব্যক্তিগত ক্ষোভ, রাগ কিংবা কান্নাকেও কনটেন্টে পরিণত করা হয়। প্রশ্ন হচ্ছে, সংবাদমাধ্যম কি মানুষের আবেগকে পণ্য বানানোর প্রতিষ্ঠান?

পরীমণির মতো আলোচিত শিল্পীদের ক্ষেত্রে এই প্রবণতা আরও বেশি দেখা যায়। তাঁর নাম থাকলেই খবরের ভিউ বাড়বে—এমন একটি ধারণা সংবাদমাধ্যমের একাংশের মধ্যে কাজ করে। ফলে তাঁর পেশাগত কাজের পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনের প্রায় প্রতিটি ঘটনা নিয়ে অতিরিক্ত আগ্রহ তৈরি হয়। কখনো কখনো মনে হয়, সংবাদ প্রকাশের চেয়ে তাঁকে নিয়ে বিতর্ক তৈরি করাই যেন বড় উদ্দেশ্য।

তবে সাংবাদিকদের সমালোচনা করতে গিয়ে পরীমণির আচরণের প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

একজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শের অভিযোগ থাকলে সেটি অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। কোনো নারী, তিনি অভিনেত্রী হোন কিংবা সাধারণ মানুষ, তাঁর সম্মতি ছাড়া তাঁকে স্পর্শ করার অধিকার কারও নেই। সাংবাদিক পরিচয় কাউকে এই অধিকার দেয় না। এমন ঘটনা ঘটলে প্রতিবাদ করার, অভিযোগ জানানোর এবং আইনগত প্রতিকার চাওয়ার অধিকার পরীমণির রয়েছে।

কিন্তু সেই প্রতিবাদেরও একটি গ্রহণযোগ্য ভাষা ও পদ্ধতি থাকা প্রয়োজন। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের সুযোগ না দিয়ে প্রকাশ্যে গালিগালাজ, হুমকি কিংবা অন্যের পেশাগত কাজে বাধা দেওয়া কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। অভিযোগ সত্য হোক বা মিথ্যা, একজন সাংবাদিককে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া কিংবা তাঁর ব্যবহৃত সরঞ্জাম কেড়ে নেওয়ার অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। এগুলোরও তদন্ত হওয়া দরকার।

পরীমণি একজন জনপ্রিয় অভিনেত্রী। তাঁর অভিনয় ও ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে মানুষের আগ্রহ রয়েছে। কিন্তু জনপ্রিয়তা যেমন তাঁকে গণমাধ্যমের প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রাখে না, তেমনি সাংবাদিকদেরও তাঁর ব্যক্তিগত মর্যাদা ও শারীরিক নিরাপত্তার সীমা অতিক্রম করার অধিকার দেয় না।

তারকা হলেই কি সব সময় হাসিমুখে ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতে হবে? সব প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে? প্রতিটি মুহূর্তে নিজের ব্যক্তিগত পরিসর বিসর্জন দিতে হবে? নিশ্চয়ই নয়। একজন শিল্পীরও ব্যক্তিগত জীবন আছে, বিরক্তি আছে, রাগ আছে, নিজের মতো করে বাঁচার অধিকার আছে। তিনি কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে না চাইলে সেটিও তাঁর অধিকার। কিন্তু সেই অধিকার প্রকাশের নামে অন্যকে অপমান বা হুমকি দেওয়ার অধিকার তাঁর নেই।

এখানে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা যেমন নিশ্চিত করতে হবে, তেমনি সাংবাদিকদেরও পেশাগত শৃঙ্খলা ও নৈতিকতা মেনে চলতে হবে। আদালত প্রাঙ্গণ কোনো বিনোদনকেন্দ্র নয়। সেখানে বিচারপ্রার্থী, আইনজীবী, বিচারক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাজের পরিবেশ বজায় রাখা জরুরি। একজন তারকাকে ঘিরে এমন ভিড় তৈরি করা, যাতে সাধারণ মানুষের চলাচল ও আদালতের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়, তা কোনোভাবেই দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার পরিচয় হতে পারে না।

একই সঙ্গে সাংবাদিকদের মনে রাখতে হবে, ক্যামেরা হাতে থাকলেই সব জায়গায় সবকিছু ধারণ করার অধিকার তৈরি হয় না। কারও গায়ে ক্যামেরা ঠেকিয়ে দেওয়া, পথ আটকে দাঁড়ানো, অনবরত প্রশ্ন ছুড়ে বিব্রত করা কিংবা প্রতিক্রিয়া আদায়ের জন্য উত্তেজনা তৈরি করা পেশাদার আচরণ নয়।

বিনোদন সাংবাদিকতা নিয়ে আরও একটি প্রশ্ন আছে। আমাদের দেশে কতজন বিনোদন সাংবাদিক নিয়মিত চলচ্চিত্রের মান, চিত্রনাট্য, অভিনয়, নির্মাণশৈলী, চলচ্চিত্রশিল্পের অর্থনীতি কিংবা শিল্পীদের সৃজনশীল কাজ নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করেন? কতজন চলচ্চিত্রশিল্পের সংকট, শিল্পীদের পারিশ্রমিক, নারী শিল্পীদের কর্মপরিবেশ, যৌন হয়রানি, চুক্তি ও নিরাপত্তা নিয়ে গভীরভাবে লেখেন?

অথচ একজন নায়িকা কার সঙ্গে সম্পর্ক করছেন, কার সঙ্গে বিরোধে জড়ালেন, কোথায় গেলেন, কী পোশাক পরলেন কিংবা কাকে কী বললেন—এসব নিয়ে খবরের অভাব নেই।

পরীমণিকে নিয়ে সংবাদ না করলেই নয়, এমন কোনো কথা নেই। বরং তাঁর অভিনীত সিনেমা, নতুন কাজ, শিল্পী হিসেবে তাঁর অর্জন, চলচ্চিত্রে তাঁর অবদান এবং চলচ্চিত্রশিল্পের সংকট নিয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন হতে পারে। কিন্তু তাঁর প্রতিটি ব্যক্তিগত প্রতিক্রিয়াকে সংবাদ বানাতে হবে কেন?

ভিউ বাড়ানোর জন্য একজন মানুষকে বারবার খোঁচানো, তাঁর রাগকে উসকে দেওয়া কিংবা তাঁকে অস্বস্তিতে ফেলে সেই দৃশ্য প্রচার করা সাংবাদিকতার মর্যাদার সঙ্গে যায় না। একইভাবে একজন তারকারও বোঝা উচিত, সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক বিরোধের নয়। গণমাধ্যম তাঁর কাজকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়। তাঁর ভুলত্রুটি তুলে ধরারও অধিকার রাখে। সেই সমালোচনা পছন্দ না হলেই সাংবাদিককে আক্রমণ করা যায় না।

এই ঘটনায় তাই কোনো এক পক্ষকে এককভাবে দায়ী করে দায় শেষ করার সুযোগ নেই। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শের অভিযোগ যেমন যাচাই করতে হবে, তেমনি পরীমণির বিরুদ্ধে গালিগালাজ, হুমকি ও সাংবাদিকদের কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগও খতিয়ে দেখতে হবে। যাঁর বিরুদ্ধে যে অভিযোগ প্রমাণিত হবে, তাঁর বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে।

তবে এই একটি ঘটনা দিয়ে পুরো সাংবাদিক সমাজ কিংবা সব বিনোদন সাংবাদিককে বিচার করাও ঠিক হবে না। পেশাদার ও দায়িত্বশীল বিনোদন সাংবাদিকরা আছেন, যাঁরা শিল্পীদের কাজ, চলচ্চিত্রের সংকট এবং সংস্কৃতির বিকাশ নিয়ে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করছেন। তাঁদের কাজও এই ভিউনির্ভর প্রবণতার কারণে প্রশ্নের মুখে পড়ছে।

আমরা চাই, বিনোদন সাংবাদিকতা তার প্রকৃত জায়গায় ফিরে আসুক। সাংবাদিকরা তারকাদের পেশাগত কাজ, শিল্পচর্চা, সৃজনশীলতা ও চলচ্চিত্রশিল্পের বাস্তব সমস্যা নিয়ে লিখুন। তারকারাও সাংবাদিকদের পেশাগত মর্যাদা ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন। প্রশ্নের উত্তর দিতে না চাইলে তা স্পষ্ট করে বলুন। কোনো অভিযোগ থাকলে প্রমাণসহ যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে যান।

সাংবাদিকতা কারও ব্যক্তিগত জীবনকে জিম্মি করার হাতিয়ার নয়। আবার তারকাখ্যাতিও কাউকে সাংবাদিককে অপমান করার লাইসেন্স দেয় না।

শেষ পর্যন্ত মনে রাখতে হবে, একজন সাংবাদিকের হাতে ক্যামেরা আছে বলে তিনি কারও ব্যক্তিগত পরিসর লঙ্ঘন করতে পারেন না। আর একজন শিল্পীর জনপ্রিয়তা আছে বলে তিনি কাউকে হুমকি বা অপমান করতে পারেন না।

ভিউয়ের জন্য সাংবাদিকতা নয়, মানুষের জন্য সাংবাদিকতা। আর জনপ্রিয়তার জন্য নয়, শিল্পের মর্যাদার জন্য শিল্পীর আচরণ।

পরীমণির এই ঘটনাটি আমাদের দুই পক্ষকেই আয়নায় নিজেদের মুখ দেখার সুযোগ করে দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, আমরা সেই আয়নায় তাকাতে প্রস্তুত কি না।