ঢাকা, বুধবার ২৫, ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ৪:২৫:২৯ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
শিক্ষকের অভাবে পাহাড়ে মাতৃভাষায় শিক্ষা ব্যাহত ব্রুকের সেঞ্চুরিতে বিজয়ী হয়ে সেমিফাইনালে ইংল্যান্ড বইমেলা শুরু হচ্ছে বৃহস্পতিবার, উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী ঈদের ট্রেনের অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু ৩ মার্চ ১০ মার্চ থেকে ১৪ উপজেলায় ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বিতরণ, মাসে ২,৫০০ টাকা ১০ হাজার শিক্ষার্থী পাবে ভাষা ও কারিগরি দক্ষতা

ইতিহাস বলে বাঙালি বরাবরই আধুনিক ও স্বাধীনচেতা জাতি

আইরীন নিয়াজী মান্না | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০১:২৪ পিএম, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ মঙ্গলবার

প্রতীকী ছবি।

প্রতীকী ছবি।

এই ভূখণ্ডের ইতিহাস ঘাঁটলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে—বাঙালি জাতিসত্তার মূল শক্তি তার যুক্তিবাদী মনন, মানবিকতা ও স্বাধীনচেতা মানসিকতা। ধর্মীয় গোঁড়ামি কিংবা অন্ধ বিশ্বাস কখনোই দীর্ঘদিন বাঙালির চিন্তাকে গ্রাস করতে পারেনি। যুগে যুগে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাঙালি নিজেকে বারবার প্রমাণ করেছে আধুনিক চিন্তার ধারক হিসেবে।
ইতিহাসবিদরা মনে করেন, বঙ্গভূমির ভৌগোলিক অবস্থান ও বহুজাতিক সাংস্কৃতিক প্রভাব বাঙালিকে শুরু থেকেই বহুমাত্রিক চিন্তাধারায় অভ্যস্ত করে তোলে। আর্য, দ্রাবিড়, মুসলিম, ইউরোপীয়—সব সভ্যতার ছাপ মিশে গড়ে উঠেছে এক ধরনের সহনশীল ও প্রশ্নমুখর সমাজচিন্তা।
মধ্যযুগেও যুক্তিবাদী ধারা: সাধারণভাবে মধ্যযুগকে ধর্মনির্ভর ও গোঁড়ামিপ্রবণ সময় হিসেবে দেখা হলেও বাংলার ইতিহাস সে ধারণাকে পুরোপুরি সমর্থন করে না। ইউরোপের মতো বাংলাতেও মধ্যযুগ ছিল ধর্মীয় প্রভাবের যুগ, কিন্তু এখানে ধর্ম কখনোই কেবল শাসনের অস্ত্র হয়ে ওঠেনি; বরং তা লোকজ সংস্কৃতি, মানবিকতা ও ব্যক্তিস্বাধীনতার সঙ্গে মিশে এক ভিন্ন চরিত্র ধারণ করেছিল।
এই সময় বাংলায় যে বৈষ্ণব আন্দোলন বিস্তার লাভ করে, তা মূলত প্রেম, মানবিকতা ও সমতার বাণী প্রচার করে। ঈশ্বরভক্তির ভাষা হয়ে ওঠে সাধারণ মানুষের ভাষা—সংস্কৃত নয়, বরং বাংলা। এতে ধর্মীয় জ্ঞান আর কেবল পুরোহিতশ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, সাধারণ মানুষের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে ধর্ম এক ধরনের সামাজিক সংহতির মাধ্যম হলেও তা অন্ধ আনুগত্যের কাঠামোয় আবদ্ধ থাকেনি।
মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যেও যুক্তিবাদী ও মানবতাবাদী চেতনার স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায়।
চণ্ডীদাস-এর কবিতায় উচ্চারিত— ‘সবার উপরে মানুষ সত্য’—এই বাক্যটি মধ্যযুগীয় সমাজের এক গভীর দার্শনিক ঘোষণা। এটি কেবল ধর্মীয় উপদেশ নয়, বরং মানুষকে ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়ার স্পষ্ট বক্তব্য। এই মানবকেন্দ্রিক দর্শনই বাঙালি সমাজকে উগ্রতা থেকে অনেকটাই দূরে রেখেছিল।

একইভাবে সুফিবাদী ধারা বাংলায় ধর্মকে কঠোর বিধিবিধানের বদলে প্রেম ও সহনশীলতার পথে চালিত করে। সুফি সাধকরা ধর্মকে মানুষের অন্তর্জগতের বিষয় হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। তাদের কাছে ধর্ম ছিল আত্মশুদ্ধির পথ, সমাজ শাসনের হাতিয়ার নয়। এর ফলে বাংলায় ইসলাম গ্রহণ করলেও তা অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে যায়—সংগীত, কাব্য ও লোকাচারের মধ্য দিয়ে।
লোকায়ত ধারার বাউল ও সাধক কবিরাও মধ্যযুগীয় বাংলায় যুক্তিবাদী চেতনার আরেকটি দিক উন্মোচন করেন। তারা বাহ্যিক আচার, মসজিদ-মন্দির কিংবা জাতপাতের বিভাজনের চেয়ে মানুষের ভেতরের সত্যকে গুরুত্ব দেন।
লালন শাহ-এর দর্শনে দেখা যায়—ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে মানুষ ও মানবিক সম্পর্কই মুখ্য। ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’—এই ধরনের বাণী মধ্যযুগীয় বাংলার ধর্মচিন্তাকে অন্ধতা থেকে অনেকটাই আলাদা করে দেয়।
এই সময়কার সমাজব্যবস্থায় যদিও রাজশক্তি ও ধর্মীয় কর্তৃত্ব বিদ্যমান ছিল, তবু বাংলার সাংস্কৃতিক পরিসরে প্রশ্ন তোলার প্রবণতা থেমে থাকেনি। কবিতা, গান ও লোককথার ভেতর দিয়ে মানুষ জীবন, সমাজ ও বিশ্বাস নিয়ে ভাবতে শিখেছিল। ধর্মীয় ভাবনা এখানে যুক্তির বাইরে নয়, বরং মানবিক ব্যাখ্যার ভেতরেই বিকশিত হয়েছিল।
ফলে মধ্যযুগের বাংলা কেবল ধর্মনির্ভর সমাজ ছিল না; বরং তা ছিল ধর্ম, মানবতা ও লোকজ যুক্তিবোধের এক মিশ্র রূপ। এই ধারাই পরবর্তীকালে ঔপনিবেশিক যুগের নবজাগরণের ভিত্তি তৈরি করে দেয়। বলা যায়, বাঙালির আধুনিক মানসিকতার শিকড় কেবল উনিশ শতকে নয়, বরং মধ্যযুগের মানবতাবাদী ও যুক্তিনির্ভর ধারাতেই প্রোথিত।

ঔপনিবেশিক যুগ ও বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণ: উনিশ শতকের বাংলায় ঔপনিবেশিক শাসনের আগমন ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন শুরু হলে শুধু রাজনৈতিক কাঠামোই পরিবর্তিত হয়নি, বরং সমাজ, শিক্ষা, অর্থনীতি ও সংস্কৃতি—সব ক্ষেত্রে এক ধরনের উত্তেজনা এবং পুনঃবিবেচনার প্রয়োজন তৈরি হয়। এই সময়েই বাংলার বুদ্ধিজীবী ও সমাজচিন্তাবিদরা একটি বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণের আন্দোলন শুরু করেন, যা সমাজকে গোঁড়ামি ও অন্ধ বিশ্বাসের বাঁধন থেকে মুক্ত করে আধুনিকতার পথে এগিয়ে নিয়ে যায়।

ঔপনিবেশিক শাসনের প্রাথমিক প্রভাব শিক্ষাক্ষেত্রে দেখা দেয়। মিশনারি বিদ্যালয়, সরকারি স্কুল ও কলেজ স্থাপন শুরু হয়। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা ইউরোপীয় দর্শন, বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী চিন্তা পায়।
দারাশিকোহর-এর প্রভাবের মতো চিন্তাধারা বাংলার বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে নবজাগরণের সূচনা করে। শিক্ষার প্রসার বাঙালির মধ্যে সামাজিক, রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত প্রশ্ন তোলার মানসিকতা জাগ্রত করে।
এই সময়ে নারী শিক্ষা, সমাজ সংস্কার ও লিঙ্গ সমতার দাবিও জোরদার হয়।
বেগম রোকেয়া নারী শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরেন এবং সমাজে নারীর স্বাধীনচিন্তার জায়গা সৃষ্টির পক্ষে শক্তিশালী অবস্থান নেন। তার কাজের মাধ্যমে বোঝা যায়, ঔপনিবেশিক যুগে বাঙালি সমাজ কেবল ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে নয়, বরং সামাজিক অন্ধ বিশ্বাস ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সমানভাবে যুক্তি ও বুদ্ধির ভিত্তিতে প্রতিবাদ গড়ে তুলেছে।
সাহিত্য ও সাংবাদিকতাও এই বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শুধু কবিতা ও গান নয়, সাহিত্যকে সমাজচেতনার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে শিক্ষিত জনগোষ্ঠীকে যুক্তিবাদী ও মানবিক চিন্তার সঙ্গে পরিচিত করান।
প্রমথ চৌধুরী-এর লেখা এবং রাজনৈতিক প্রবন্ধও তখনকার সময়ে নতুন চিন্তাধারার দিশা দেখায়। এই বুদ্ধিজাগরণ কেবল সাহিত্য ও শিক্ষায় সীমাবদ্ধ ছিল না—সাংস্কৃতিক আন্দোলন, নাট্যচর্চা ও সমাজ সংস্কারেও এর ছাপ স্পষ্ট।
ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে বাঙালির প্রতিরোধও এই বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। শিক্ষিত বাঙালি তখন সমাজের কুসংস্কার, নীতি-অনৈতিকতা এবং অর্থনৈতিক শোষণ সম্বন্ধে সচেতন হয়। সামাজিক আন্দোলন যেমন শ্রমিক অধিকার, কৃষক আন্দোলন এবং নারী স্বাধীনতার দাবি—সবকিছুই যুক্তি ও মানবিকতার ভিত্তিতে এগিয়ে আসে। বাঙালি এই সময়ে বুঝতে শেখে, শাসক পরিবর্তন করলে সমস্যার মূলে না গিয়ে শুধুই বাহ্যিক পরিবর্তন হয়; প্রকৃত পরিবর্তন আসে শিক্ষিত চিন্তা, যুক্তি ও মানবিক মূল্যবোধের মাধ্যমে।
ফলে ঔপনিবেশিক যুগ বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণের ক্ষেত্রে এক অভূতপূর্ব সময়। এটি কেবল বিদেশী আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ নয়, বরং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পুনর্গঠনের যুগ। এই জাগরণের ধারাবাহিকতাই পরবর্তীতে ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং আধুনিক বাংলা চিন্তার ভিত্তি গড়ে তোলে। বাংলার মানুষ তখন স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে—ধর্ম, শাসক বা প্রথা মানুষকে যতদূরই সীমাবদ্ধ করতে পারে, বাঙালির যুক্তিবাদী ও আধুনিক মানসিকতাকে কখনো চিরস্থায়ীভাবে দমন করা সম্ভব নয়।
ভাষা আন্দোলন: ধর্মের ঊর্ধ্বে জাতিসত্তা: ১৯৫০-এর দশকের শুরুতে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলে ধর্মকে রাষ্ট্রের পরিচয়ের প্রধান উপাদান হিসেবে ঘোষণা করা হয়। তবে এই সিদ্ধান্তে সমগ্র বাঙালি জাতি স্পষ্টভাবে অসন্তুষ্ট। বাংলাভাষী মানুষের কাছে মাতৃভাষা কেবল এক ভাষা নয়, এটি তাদের সাংস্কৃতিক, ঐতিহ্যগত এবং জাতিগত পরিচয়ের মূল ভিত্তি। ধর্মীয় পরিচয় রাষ্ট্রের নির্ধারণমূলক উপাদান হলেও, বাঙালি বুঝতে পেরেছিল—জাতিসত্তার গভীরত্ব কেবল ধর্মে সীমাবদ্ধ নয়, বরং ভাষা ও সংস্কৃতিতে নিহিত।
১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এই অসন্তোষ ক্রান্তিকাল হয়ে ওঠে। সরকার নির্দেশ দেয় বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি না দেওয়ার জন্য। এতে মানুষ জাগ্রত হয়। শিক্ষার্থী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও সাধারণ মানুষ—সব ধরনের বাঙালি তখন এক হয়ে দাঁড়ায়। আন্দোলনটি কেবল রাজনৈতিক দাবি ছিল না; এটি ছিল মানবিক, সাংস্কৃতিক এবং স্বাধীনচেতা প্রতিরোধের প্রতীক।
ভাষা আন্দোলনে শহীদদের আত্মত্যাগ প্রমাণ করে যে, বাঙালির কাছে ধর্ম নয়, মাতৃভাষা ও সাংস্কৃতিক অধিকারই মুখ্য। সরকারি সেনাবাহিনী এবং পুলিশ বন্দুকের মুখে দাঁড়ালে শিক্ষার্থীরা মরেও দমে না।
রফিক উদ্দিন, আবদুল জব্বার-এর মতো মানুষরা প্রাণ দিয়ে প্রমাণ করেন যে, বাঙালি জাতি কখনোই ধর্মের দাস হয়ে থাকতে চায় না। মাতৃভাষা তাদের স্বাধীনচেতার প্রতীক।
ভাষা আন্দোলন শুধু একটি ভাষার জন্য লড়াই ছিল না। এটি ছিল জাতিসত্তার সংজ্ঞা প্রসার, যা দেখিয়েছে—বাঙালি জাতি তার পরিচয় ধরে রাখার জন্য ধর্মের ঊর্ধ্বে দাঁড়াতে জানে। আন্দোলনের সময়কালে সংস্কৃতি, সাহিত্য, সংগীত ও গণমানুষের ঐক্য—সবকিছুই একত্রে মিলিত হয়ে আন্দোলনকে শক্তিশালী করেছে। আন্দোলন শুধু সাফল্যের জন্য নয়, বরং মানবাধিকার ও সাংস্কৃতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ছিল।
ভাষা আন্দোলনের প্রভাব আজও বাংলার সমাজে স্পষ্ট। বাংলাদেশের সংবিধানেই বলা আছে—‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা’। এটি শুধুমাত্র প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং বাঙালির স্বাধীনচেতা ও আধুনিক মানসিকতার স্বীকৃতি। শিক্ষার্থী ও সংস্কৃতিবিদদের সংগ্রামের কারণে আজ বাঙালি জাতি প্রমাণ করতে পেরেছে যে, ধর্ম নয়, চেতনা ও সাংস্কৃতিক অধিকারই জাতিসত্তার মূল ভিত্তি।
এই আন্দোলনের ধারাবাহিকতাই পরবর্তীকালে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তি স্থাপন করে। ভাষা আন্দোলন শেখায়—যখন রাষ্ট্র ধর্মের নামে অধিকার দমন করতে চায়, তখন বাঙালি তার জাতিসত্তা, সংস্কৃতি ও স্বাধীনচেতা মনন রক্ষা করতে আত্মত্যাগ করতে প্রস্তুত। আন্দোলনের বার্তা আজও প্রাসঙ্গিক: বাঙালি জাতি কখনোই অন্ধ গোঁড়ামির অধীনে থাকে না, বরং প্রতিটি যুগে নিজের চিন্তা ও সংস্কৃতিকে রক্ষা করে।
ফলে ভাষা আন্দোলন কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়, এটি বাঙালির মানবিকতা, যুক্তিবাদ ও স্বাধীনচেতা মানসিকতার এক চিরন্তন প্রতীক। আন্দোলন প্রমাণ করে—ধর্ম কখনো বাঙালির জাতিসত্তাকে সীমাবদ্ধ করতে পারেনি, বরং ভাষা ও সংস্কৃতি তাদের পরিচয়ের প্রকৃত নির্দেশক।
মুক্তিযুদ্ধ, ধর্ম নয়, মুক্তিই মুখ্য: ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বাংলার ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়। এই সময়কালে স্পষ্ট হয়ে ওঠে—বাঙালি জাতির পরিচয় ধর্মের ভিত্তিতে নয়, বরং স্বাধীনতা, সংস্কৃতি এবং মানবিক অধিকারকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ধর্মকে রাষ্ট্রের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিল, কিন্তু বাঙালি জনগণ তা প্রত্যাখ্যান করে। এ লড়াই ছিল কেবল রাজনৈতিক নয়, বরং সাংস্কৃতিক, জাতিগত ও মানবিক অধিকার রক্ষার যুদ্ধ।
মুক্তিযুদ্ধের পূর্বভাগে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাঙালিকে ধ্বংসের হুমকি দেয়। তাদের পরিকল্পনা ছিল—ধর্মীয় পরিচয় ব্যবহার করে বাঙালি জাতিকে বিভক্ত করা। কিন্তু বাস্তবতা দেখালো—ধর্মীয় ভিত্তি দিয়ে জাতি গঠন করা যায় না। বাঙালি তখন একত্রিত হয় ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং স্বাধীনচেতার মূল্যবোধের কারণে। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, কৃষক, শ্রমিক, সাহিত্যিক ও সাধারণ মানুষ—সবাই হাতে অস্ত্র বা প্রচারণার মাধ্যম নিয়ে মুক্তির আন্দোলনে অংশ নেয়।
মুক্তিযুদ্ধ শুধু সামরিক লড়াই নয়। এটি ছিল একটি মানবাধিকার-উদ্দীপিত আন্দোলন, যা প্রমাণ করল—বাঙালি জাতি তার স্বাধীনতা হারতে পারে না, ধর্মীয় ভেদাভেদ দিয়ে তাকে সীমাবদ্ধ করা সম্ভব নয়। শহীদদের আত্মত্যাগ, গণহত্যার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এবং সাধারণ মানুষের অসীম সাহস—সবই ধর্ম নয়, মুক্তির জন্য ছিল।
মুজিবুর রহমান-এর নেতৃত্বে এই একাত্মতা প্রকাশ পায়। তাঁর সংবেদনশীল ও যুক্তিসম্পন্ন নেতৃত্ব বাঙালিকে প্রমাণ করতে সাহায্য করে যে, জাতিসত্তার মূল ভিত্তি হলো স্বাধীনতা ও মানবিক অধিকার, ধর্ম নয়।
মুক্তিযুদ্ধের সময় সাহিত্যে, সংগীতে এবং গণমাধ্যমেও এই বার্তা ছড়িয়ে পড়েছিল। কবিতা, গান এবং সংবাদপত্রে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করা হয়—ধর্মের বিভাজন নয়, স্বাধিকার ও মর্যাদাই মূল লক্ষ্য।
কাজী নজরুল ইসলাম-এর সাহিত্য এবং অন্যান্য বাঙালি কবিদের গান ও লেখা জনগণের মধ্যে জাতিসত্তার চেতনা জাগিয়ে তোলে, যা যুদ্ধকালীন একাগ্রতা ও আত্মত্যাগকে আরও শক্তিশালী করে।
মুক্তিযুদ্ধের ফলাফলও এই ধারণাকে প্রমাণ করে। পাকিস্তানি বাহিনী হেরে গেলে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয় এক স্বাধীন, ধর্মনিরপেক্ষ ও সাংস্কৃতিকভাবে স্বতন্ত্র রাষ্ট্র হিসেবে। সংবিধানে স্পষ্টভাবে বলা হয়—রাষ্ট্র ধর্মনিরপেক্ষ, মানবাধিকার রক্ষার জন্য নিবেদিত।
ফলে মুক্তিযুদ্ধ প্রমাণ করে—বাঙালি জাতি কখনো ধর্মের তাগিদে দমন বা বিভক্ত হতে চায় না। বরং সে সবসময় স্বাধীনচেতা, যুক্তিবাদী ও মানবিক মূল্যবোধের অধিকারী, যা তার ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় স্পষ্ট। মুক্তির এই চেতনা আজও বাঙালির সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক মানসিকতার মূল ভিত্তি।
মুক্তিযুদ্ধ তাই কেবল একটি রাজনৈতিক যুদ্ধ নয়; এটি ধর্মনিরপেক্ষ জাতিসত্তার এবং আধুনিক বাঙালির আত্মপরিচয়ের চূড়ান্ত প্রকাশ। বাঙালি ইতিহাস প্রমাণ করেছে—যদি জাতি তার স্বাধীনতা ও মর্যাদার জন্য একত্রিত হয়, কোনো ধর্ম, শাসক বা বাহ্যিক শক্তি তাকে দমন করতে পারে না।
সাম্প্রতিক বাস্তবতা ও সামাজিক দ্বন্দ্ব: আজকের সময়ে বাঙালি সমাজ, ইতিহাসের ধারাবাহিকতা রেখে, এখনও আধুনিকতা, যুক্তিবাদ এবং মানবিক চেতনার মধ্যে অটুট অবস্থান ধরে রেখেছে। তবে বৈশ্বিক রাজনীতি, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সংঘাতের প্রভাবে কিছু স্থানীয় পর্যায়ে ধর্মীয় উগ্রতা ও সামাজিক দ্বন্দ্বের চিহ্ন দেখা যাচ্ছে। এ প্রবণতা কখনোই বাঙালির মূল চরিত্রকে প্রতিফলিত করে না; বরং এটি বহিরাগত রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবের প্রতিফলন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমরা লক্ষ্য করেছি—ধর্মীয় ভিত্তিতে বিভাজন ও মতাদর্শের সংঘাত নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। সামাজিক মিডিয়ায় ভুল তথ্য, গুজব এবং রাজনৈতিক উস্কানিতে কিছু মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে অপ্রয়োজনীয় সংঘাতের দিকে ধাবিত হচ্ছে। তবুও, বাঙালি জনগণ ঐতিহ্যগতভাবে সাংস্কৃতিক সহনশীলতা, যুক্তি এবং মানবিক মূল্যবোধকে অগ্রাধিকার দেয়।
শিক্ষা, সাহিত্য, সংগীত ও সাংস্কৃতিক উৎসবের মাধ্যমে মানুষ সচেতন এবং সংঘাত প্রতিরোধে সক্রিয়। বইমেলা, নাট্যোৎসব, সংগীত অনুষ্ঠান এবং গণসাংস্কৃতিক কার্যক্রম—সবই আধুনিক বাঙালির মুক্তচিন্তা এবং যুক্তিবাদী চেতনার প্রতিফলন। এই প্রক্রিয়ায় সমাজে গোঁড়ামি বা অন্ধবিশ্বাসের প্রভাব সীমিত থাকে।
একইভাবে, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক আন্দোলন, নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগগুলোও বাঙালির স্বাধীনচেতা ও যুক্তিবাদী মননকে প্রকাশ করে। গবেষকরা দেখিয়েছেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘর্ষ বা বিতর্কের সময়ও সাধারণ মানুষ বুদ্ধি ও সংলাপের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান খোঁজে, অন্ধভাবে কোনো ধর্মীয় বা রাজনৈতিক গোষ্ঠীর নির্দেশনা অনুসরণ করে না।
সাম্প্রতিক বাস্তবতার আরেকটি দিক হলো—বিশ্বায়নের সঙ্গে সঙ্গে বাঙালি সমাজে বৈচিত্র্য বৃদ্ধি। আন্তর্জাতিক সংস্কৃতি, প্রযুক্তি ও আধুনিক শিক্ষার প্রভাবে যুব সমাজে গণতান্ত্রিক চেতনা, মানবাধিকারের মূল্যবোধ এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের ধারণা দৃঢ় হয়েছে। এটি দেখায় যে, সমাজে সংঘাত থাকলেও, মৌলিক আধুনিকতা ও যুক্তিবাদী চেতনা এখনও শক্ত অবস্থানে রয়েছে।
ফলে বর্তমান সময়ের সামাজিক দ্বন্দ্ব শুধুমাত্র সময়ের প্রয়োজনীয় চ্যালেঞ্জ। ইতিহাসের প্রমাণ দেখায়—বাঙালি কখনোই অন্ধ গোঁড়ামির শিকার হয়নি। বরং সে সর্বদা যুক্তি, মানবিক মূল্যবোধ এবং স্বাধীনচেতা চিন্তার মাধ্যমে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে। সাম্প্রতিক বাস্তবতা এ কথাই স্পষ্ট করে যে, বাঙালির আধুনিক মানসিকতা, মানবিকতা এবং মুক্তচিন্তার চেতনাই তার সমাজের মূল ভিত্তি।
উপসংহার: ইতিহাসের দীর্ঘ ধারাবাহিকতায় দেখা যায়—বাঙালি কখনোই পুরোপুরি ধর্মীয় অন্ধতায় আচ্ছন্ন হয়নি। বরং প্রতিটি যুগে সে প্রশ্ন তুলেছে, যুক্তি খুঁজেছে এবং মানবিকতার পথে হাঁটতে চেয়েছে।
ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ, সাহিত্য আন্দোলন থেকে নারী অধিকার—সব ক্ষেত্রেই বাঙালির অবস্থান ছিল আধুনিক ও স্বাধীনচেতা। তাই বলা যায়, ধর্ম বাঙালির বিশ্বাস হতে পারে, কিন্তু অন্ধতা তার পরিচয় নয়।
এই জাতির ইতিহাসই সাক্ষ্য দেয়—বাঙালি বরাবরই আধুনিক, মানবিক এবং স্বাধীনচিন্তার ধারক।
 
আইরীন নিয়াজী মান্না-শিশুসাহিত্যিক ও সাংবাদিক। সম্পাদক-উইমেননিউজ২৪.কম, কিশোর লেখা।