ঢাকা, শনিবার ২১, ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৫:৩৩:৪২ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
ভারতে ডাইনি অপবাদে মা ও শিশুকে পুড়িয়ে হত্যা শহীদ মিনারে আমার ওপর নগ্ন হামলা হয়েছে—রুমিন ফারহানার অভিযোগ বিশ্বে বায়ুদূষণে শীর্ষে কাবুল, দ্বিতীয় অবস্থানে ঢাকা নারী ভাষা সৈনিকরা আজও অবহেলিত ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা জানালেন রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী অমর একুশে ফেব্রুয়ারি ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস আজ

ভারতে ডাইনি অপবাদে মা ও শিশুকে পুড়িয়ে হত্যা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ১২:২৭ পিএম, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ শনিবার

ছবি: সংগ্রহিত।

ছবি: সংগ্রহিত।

ভারতে ডাইনি অপবাদে এক মা ও তার ১০ মাসের শিশুপুত্রকে জ্যান্ত পুড়িয়ে হত্যার ঘটনা আবারও নাড়া দিল দেশটিকে। ঝাড়খণ্ড রাজ্যের এক প্রত্যন্ত আদিবাসী গ্রামে ঘটে যাওয়া এই নির্মম ঘটনার পর চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গুরুতর দগ্ধ অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি আছেন নিহত নারীর স্বামী।

ঘটনাটি ঘটেছে ভারতের ঝাড়খণ্ড রাজ্যে, রাজধানী রাঁচি থেকে প্রায় ২৫০ কিলোমিটার দূরে কুদসাই নামের একটি ছোট আদিবাসী গ্রামে। মাটির তৈরি প্রায় ৫০টি ঘর নিয়ে গড়ে ওঠা এই গ্রামে আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা বা প্রশাসনিক তদারকি কার্যত নেই বললেই চলে।

গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় গ্রামজুড়ে ছড়িয়ে পড়া গুজবের জেরে জনতা হামলা চালায় জ্যোতি সিংকু নামের এক নারীর বাড়িতে। অভিযোগ ওঠে, তিনি নাকি ‘ডাইনি’ বা জাদুটোনা চর্চা করেন এবং গ্রামের এক ব্যক্তির অসুস্থতা ও মৃত্যুর জন্য দায়ী। সেই অভিযোগের জেরে তাকে ও তার ১০ মাস বয়সী শিশুপুত্রকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়।

গ্রামে সম্প্রতি কয়েকটি গবাদিপশুর হঠাৎ মৃত্যু এবং পুস্টুন বিরুয়া নামের এক স্থানীয় ব্যক্তির অসুস্থতা ও পরবর্তী মৃত্যুকে কেন্দ্র করে আতঙ্ক তৈরি হয়। 

পুস্টুনের স্ত্রী জানো বিরুয়া জানান, তার স্বামী উদ্বেগ ও অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার সমস্যায় ভুগছিলেন। গ্রামে চিকিৎসক না থাকায় তিনি এক হাতুড়ে ডাক্তারের শরণাপন্ন হন। 

ওই ব্যক্তি জানান, তার স্বামীর কোনো শারীরিক অসুখ নেই। হাসপাতালে নেওয়া হয়নি কেন—এমন প্রশ্নে জানো বলেন, দারিদ্র্যের কারণে দূরের হাসপাতালে নেওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। এরপরই গ্রামে কানাঘুষা শুরু হয়—জ্যোতি সিংকু নাকি জাদুবিদ্যা চর্চা করছেন এবং তিনিই পুস্টুনের অসুস্থতার কারণ।

পুস্টুন বিরুয়া মারা যাওয়ার পরই পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়। জ্যোতির স্বামী কোলহান সিংকু, যিনি বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন, জানান—সেদিন রাতে প্রায় ১২ জন তাদের বাড়িতে হামলা চালায়। হামলাকারীদের মধ্যে পাঁচজন নারীও ছিলেন। তারা কোনো কথা না শুনেই তার স্ত্রী ও শিশুর গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়।

হাসপাতালের শয্যায় শুয়ে কোলহান বলেন, “আমি হাতজোড় করে বলেছিলাম, বিষয়টি গ্রাম পঞ্চায়েত বা সালিশে মীমাংসা করা হোক। কিন্তু তারা আমার কথা শোনেনি।” 

এই ঘটনায় কোলহান নিজেও গুরুতরভাবে দগ্ধ হয়েছেন। পরিবারের আরেক সদস্যও হামলায় আহত হন। ঘটনার পর জেলা পুলিশ হত্যা ও অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের মামলা দায়ের করেছে। কোলহান সিংকু এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের বয়ানের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু হয়।

পুলিশ ইতিমধ্যে চারজন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করেছে। অভিযুক্তরা বর্তমানে পুলিশি হেফাজতে রয়েছে। তারা এখনো প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেনি। হামলায় জড়িত অন্যদের ধরতে একটি বিশেষ দল গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। একই সঙ্গে কুসংস্কারবিরোধী সচেতনতা বাড়াতে গ্রামাঞ্চলে বিশেষ কর্মসূচি নেওয়ার কথাও জানিয়েছে প্রশাসন।

ডাইনি অপবাদে হত্যার ঘটনা ভারতে নতুন নয়। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে দেশে ডাইনি সন্দেহে ২ হাজার ৫০০ জনের বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। নিহতদের অধিকাংশই নারী। মাত্র কয়েক মাস আগেই প্রতিবেশী বিহার রাজ্যে একই অভিযোগে একটি পরিবারের পাঁচ সদস্যকে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের ঘটনা সাধারণত সুবিধাবঞ্চিত আদিবাসী ও প্রত্যন্ত এলাকাগুলোতে বেশি ঘটে। সেখানে শিক্ষার অভাব, স্বাস্থ্যসেবার অপ্রতুলতা এবং কুসংস্কারের গভীর প্রভাব মানুষকে যুক্তির চেয়ে গুজবে বেশি বিশ্বাসী করে তোলে।

গ্রামে আধুনিক চিকিৎসার অভাব থাকায় মানুষ হাতুড়ে ডাক্তার বা ওঝার ওপর নির্ভর করে। কোনো অস্বাভাবিক মৃত্যু বা অসুস্থতার কারণ না বুঝতে পারলেই ‘ডাইনি’ তকমা দিয়ে কাউকে দায়ী করা হয়। আর সেই অভিযোগই কখনো কখনো রূপ নেয় ভয়াবহ গণপিটুনি বা হত্যাকাণ্ডে।

ঝাড়খণ্ডের কুদসাই গ্রামের এই মর্মান্তিক ঘটনা আবারও দেখিয়ে দিল—আইন থাকলেও কুসংস্কার নির্মূল না হলে এমন সহিংসতা থামানো কঠিন। পুলিশের অভিযান ও গ্রেপ্তার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলেও, দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও সচেতনতা বৃদ্ধিই হতে পারে স্থায়ী সমাধান। একটি অসহায় মা ও তার শিশুর মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো সমাজের বিবেককে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। কুসংস্কারের অন্ধকার ভাঙতে প্রশাসন ও সমাজ—দু’পক্ষেরই সমান দায়িত্ব রয়েছে। 

তথ্যসূত্র : বিবিসি