ঢাকা, সোমবার ২৩, ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ৪:৩৭:১২ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
রাইজিং স্টার্স নারী এশিয়া কাপ: ফাইনালে হার বাংলাদেশ ‘এ’ দলের থার্ড টার্মিনাল দ্রুত চালুর উদ্যোগ, বললেন বিমানমন্ত্রী বিএনপির সাবেক মন্ত্রী সেলিমা রহমান সিসিইউতে রাষ্ট্রপতি ও স্পিকার পদে কারা আলোচনায় রোজায় বাড়তি খরচ, হিমশিম খাচ্ছে নিম্নআয়ের মানুষ

চকবাজারের রাজকীয় ইফতার ‘বড় বাপের পোলায় খায়’

রাতুল মাঝি | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ১১:৩৫ এএম, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ রবিবার

ছবি: সংগ্রহিত।

ছবি: সংগ্রহিত।

পুরান ঢাকার রমজান মানেই ইফতারের রাজকীয় আয়োজন। আর সেই আয়োজনের মধ্যমণি এক বিশেষ খাবার—নামেই যার রাজকীয়তা, ‘বড় বাপের পোলায় খায়’। শত শত ইফতারির ভিড়ে এই একটি পদ যেন আলাদা করে নজর কাড়ে। দামেও আলাদা, স্বাদেও আলাদা, আর ইতিহাসেও অনন্য।

পবিত্র রমজান এলেই পুরান ঢাকার চকবাজার হয়ে ওঠে ইফতারপ্রেমীদের তীর্থস্থান। বিকেল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসে বাহারি ইফতার কিনতে। কাবাব, রোস্ট, হালিম, জিলাপির ভিড়ে এক কোণে বিশেষ জায়গা দখল করে থাকে এই রহস্যময় নামের খাবারটি—‘বড় বাপের পোলায় খায়’। 

রমজান মাসে ইফতার আইটেম হিসেবে পুরান ঢাকার চকবাজার, নাজিমুদ্দিন রোড, চক সার্কুলার রোড, নর্থ-সাউথ রোড এবং শাহী মসজিদ সেক্টরের পাশে অবস্থিত ইফতার বাজারগুলোয় বড় বাপের পোলায় খায় বিক্রি হয়ে থাকে। এসব এলাকায় রমজান মাসে বিক্রেতাদের স্লোগাম ‘বড় বাপের পোলায় খায়, ঠোঙায় ভরে নিয়ে যায়’ ক্রেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

নামেই গল্প: নাম শুনলেই কৌতূহল জাগে—এটা আবার কী খাবার? কেন এমন নাম?
বিক্রেতাদের ভাষ্য, একসময় নবাবি আমলের প্রভাব আর ঢাকাই মশলার ঐতিহ্য মিলিয়ে তৈরি হয়েছিল এই বিশেষ ইফতারি। নামটি মূলত রসিকতার ছলে রাখা—যেন বোঝানো হয়, এটি সাধারণ ইফতার নয়, বরং “বড়লোকি” স্বাদের প্রতীক।

কী দিয়ে বানানো হয়: এই খাবার তৈরিতে লাগে গরু ও খাসির মাংস, সুতি কাবাব, কিমা, ডাল (ডাবলি ও বুটের ডাল), ডিম, মগজ, আলু, ঘি, কাঁচা ও শুকনা মরিচসহ বহু রকম মসলা। সব উপকরণ একসঙ্গে ধীরে ধীরে রান্না করে তৈরি হয় ঘন, ঝাল-ঝাল, মসলাদার এক বিশেষ পদ।
এক প্লেটে যেন ঢাকার শাহী রান্নার পুরো ইতিহাস সাজানো থাকে।

প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে: বর্তমান বিক্রেতারা জানান, প্রায় ৭০–৮০ বছর আগে তাঁদের পূর্বপুরুষ এই খাবার বিক্রি শুরু করেন। তখন থেকেই রমজান এলেই এই বিশেষ ইফতার বানানো হয়।
দাদার হাতের রেসিপি এখন নাতিদের হাতে। রেসিপির মূল উপাদান বদলায়নি, বদলায়নি নামটাও। সময় বদলেছে, শহর বদলেছে, কিন্তু ‘বড় বাপের পোলায় খায়’ আজও আগের মতোই চকবাজারের প্রধান আকর্ষণ।

দামেও রাজকীয়: এই খাবার সস্তা নয়। প্রতি কেজি বিক্রি হয় প্রায় ৮০০ টাকা দরে। তবু প্রতিদিনই ক্রেতাদের লম্বা লাইন দেখা যায়।
শামীম আলম নামে একজন ক্রেতা বলেন, “সারা বছর এই খাবার পাওয়া যায় না। রমজানে একবার হলেও না খেলে মনে হয় রোজাই পূর্ণ হলো না।”

শুধু খাবার নয়, আবেগ: অনেকের কাছে এটি শুধু একটি ইফতারি আইটেম নয়, বরং পুরান ঢাকার স্মৃতি।
যাঁরা ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে চকবাজারে এসে এই খাবার কিনেছেন, তাঁরাই এখন নিজের সন্তানকে নিয়ে আসেন সেই একই জায়গায়।

আহমেদ জসীম সরদার নামে এক প্রবীণ ক্রেতা বলেন, “এই খাবারের স্বাদ আমার শৈশবের স্বাদ। ইফতার মানেই আমার কাছে ‘বড় বাপের পোলায় খায়’।”

সময়ের সঙ্গে টিকে থাকা ঐতিহ্য: আজকের ফাস্টফুড আর বার্গার-পিজার যুগেও এই ঐতিহ্যবাহী ইফতার টিকে আছে মানুষের ভালোবাসায়। আধুনিক প্যাকেটজাত খাবারের ভিড়ে ‘বড় বাপের পোলায় খায়’ যেন পুরান ঢাকার আত্মার প্রতিনিধি।

শেষ কথা: রমজান আসবে, যাবে। ইফতারির মেনু বদলাবে। কিন্তু চকবাজারের এই রাজকীয় খাবারটি থেকে যাবে ঢাকার ইতিহাসের পাতায়।
‘বড় বাপের পোলায় খায়’ শুধু একটি পদ নয়—এটি পুরান ঢাকার সংস্কৃতি, স্মৃতি আর রসনার মিলনমেলা।